Homeধর্মযশোরে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের ২শ' বছরের প্রাচীণ রথাযাত্রা অনুষ্ঠিত

যশোরে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের ২শ’ বছরের প্রাচীণ রথাযাত্রা অনুষ্ঠিত

বিলাল মাহিনী, যশোর :

যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহি ভাটপাড়া বাজারে শ্রী শ্রী জগন্নাথধাম ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে ১জুলাই ২০২২ শুক্রবার রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, বিগত ২০২০ এবং ২০২১ আড়ম্বরে রথযাত্রা অনুষ্ঠান হয়নি বিশ্ব মহামারি করোনার কারণে। কিন্তু এবছর ২০২২ সালের রথযাত্রা অনুষ্ঠান পূর্বের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিল। সনাতন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের প্রধান উত্‍‌সব হল রথযাত্রা।

পুরাণ অনুসারে- আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে শ্রী শ্রী জগন্নাথ, শ্রী মাতা সুভদ্রা ও শ্রী শ্রী বলরাম রথে চড়ে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পত্নী গুণ্ডিচার বাড়ি যেটাকে বলা হয় জগন্নাথ দেবের ‘মাসীর বাড়ি’ এবং সাত দিন পরে সেখান থেকে আবার তিনি নিজের মন্দিরে ফিরে আসেন। রথে চড়ে ওই গমন ও প্রত্যাগমনকে (সোজা)রথ ও (উল্টো)রথ বলা হয়। রথযাত্রা’ আবার পতিতপাবনযাত্রা, নবযাত্রা, গুণ্ডিচাযাত্রা, মহাবেদীযাত্রা, নন্দীঘোষযাত্রা নামেও পরিচিত। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রথযাত্রা বিষয়ে বলেন,
“রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম,
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।
পথ ভাবে আমি দেব রথ ভাবে আমি,
মূর্তি ভাবে আমি দেব—হাসে অন্তর্যামী।”
রথযাত্রা বিষয়ে হিন্দুধর্মের কঠোপনিষদে আছে,
“আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেব তু।
বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি মন: প্রগ্রহমেব চ।। (১/৩/৩)এর অর্থ হচ্ছে –“এই দেহই রথ আর আত্মা দেহরূপ রথের রথী। আর ঈশ্বর থাকেন অন্তরে। তার মানে দাঁড়ায় ঈশ্বর আমাদের অন্তরে থাকেন। তাঁর কোন রূপ নেই। তিনি সর্বত্র বিরাজিত”।

পবিত্র বেদে বলা হয়েছে, “আবাঙমানসগোচর”। যার অর্থ হলো মানুষের বাক্য এবং মনের অতীত। আমরা মানুষ তাই তাকে মনের ভাবের সাথে মিলিয়ে সাজাই। প্রায় ২০০ বছরের পূরাতন এই ঐতিহ্যের কথা শুনলেই অভয়নগর তথা এই অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ সনাতনধর্মের মানুষের সামনে যে ছবিটা ভেসে উঠে সেটা হচ্ছে, হাজার হাজার ভক্তেরা শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেব, সুভদ্রা ও বলরাম কে রথে বসিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাদের মাসীর বাড়িতে। রথের সামনে ছড়িয়ে পরছে পুষ্পবৃষ্টি , হরি নাম কীর্তনে মুখরিত চারিদিক।

নাগরদোলা, সার্কাস, বিভিন্নরকম মিষ্টি, ফলফলাদির পশরা, পাখির দোকান, ইলিশ মাছসহ নানা প্রকার দোকান নিয়ে বসেন দোকানীরা।

আবাল, বৃদ্ধ, যুবক সকল বয়সের মানুষের আগমন পরিলক্ষিত হয়। সকালের দিকে অভয়নগরের ভাটপাড়া শ্রী শ্রী জগন্নাথ মন্দিরে পূজাপাঠ শুরু হয়। পূজাকার্য পরিচালনা করেন মন্দিরের সেবক শ্রী রবীন্দ্রনাথ গোস্বামী।

পূজা পর্ব সমাপ্তির পর ভক্তবৃন্দের কাঁধে চড়ে শ্রী শ্রী জগন্নাথ, বলরাম, শুভদ্রামুর্তি রথে স্থাপন করা হয়। জগন্নাথ জিউ কী, বলরাম জিউ কী, শুভদ্রামই কী ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ভাটপাড়া বাজার। বাঘুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে স্থাপিত রথ পর্যন্ত শ্রী ঠাকুর বিগ্রহসমূহ ভক্তগণ কাঁধে করে নিয়ে যায়।

হাজর হাজার ভক্তের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ভাটপাড়া বাজার। এঅঞ্চলের সনাতন হিন্দুধর্মাবলম্বী ও আপামরসাধারণের উপস্থিতিতে মুখরিত হয় চারিদিক। পূজা শেষে প্রসাদ বিতরণ অনুষ্ঠান চলতে থাকে। পান সুপারির ভোগ প্রদান ভাটপাড়া রথের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।

বাংলার ঐতিহ্য গ্রামীন মেলা সে কথা পরিপূর্ণতা পেতে অভয়নগরের বাঘুটিয়া ইউনিয়নের ভাটপাড়া রথের মেলা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এ রথের মেলা দেখতে ও উপভোগ করতে ছুটে আসে। কঠোর নিরাপত্তার বিধানে সক্ষম আইনশৃংখলা বাহিনী। কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই স্বার্থকতা পেল ২০২২ সালের রথযাত্রা।

ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, পেশাকে উপেক্ষা করে সবাই একত্রিত হয়ে উপভোগ করলো অভয়নগরবাসী। এ অনুষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি বাঘুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান জনাব তৈয়েবর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক বাবু তাপস কুমার দাসের উপস্থিতিতে এসকল কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয়। এ ছাড়াও আরো উপস্থিত ছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা দিলীপ গোস্বামী ,পুজা পরিষদের সহসভাপতি মাস্টার অজিত কুমার পাল,ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ নেতা মাস্টার আমিনুর রহমান, প্যানেল চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান আজাদ,বিএনপি নেতা ইকরাম বিশ্বাস,আশিষ নন্দী,ইউপি সদস্য রেহেনা বেগম, হাফিজুর রহমান, রুনা বেগম,মাহবুর সরদার, রাজু সরদার,মোস্তফা মনা,জিয়া চৌধুরী, পুজা পরিষদ নেতা অশোক কুমার সরকার,বাজার কমিটির সাবেক সভাপতি শেখ সহিদুল ইসলাম,রমেশ সরকার মিন্টু কুমার সেন,নরেন বিশ্বাস,শিশির বর্মণ,ভজহরি বর্মন,শ্যামল কুমার,সুবাস বিশ্বাস প্রমুখ। আগামী ৯ জুলাই ২০২২ শনিবার উল্টো রথ অনুষ্ঠিত হবে।

RELATED ARTICLES

Most Popular