Homeধর্মমহানবীর সা. বিদায় হজের ভাষণ : মানবতার মুক্তির সনদবিলাল হোসেন মাহিনী

মহানবীর সা. বিদায় হজের ভাষণ : মানবতার মুক্তির সনদবিলাল হোসেন মাহিনী

বিদায় হজের ভাষণ নবিজী সা. এর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, মানবতার ঐতিহাসিক দলিল, ইসলামের পরিপূর্ণতার স্বীকৃতি এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে কুরআন-সুন্নাহর সংক্ষিপ্ত নির্যাস। খোদাভীতির ভিত্তিতে মানবতাবোধসম্পন্ন জাতি গঠনে এ ভাষণের গুরুত্ব অপরিসীম। বিদায় হজ্জের ভাষণ দশম হিজরি অর্থাৎ ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে হজ পালনকালে আরাফাতের ময়দানে ইসলাম ধর্মের শেষ রাসুল মুহাম্মাদ সা. কর্তৃক প্রদত্ত খুৎবা বা ভাষণ। হজের দ্বিতীয় দিনে আরাফাতের মাঠে অবস্থানকালে জাবাল-এ-রাহমাত টিলার শীর্ষে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সমবেত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে তিনি এই ভাষণ দিয়েছিলেন।

সহীহ বুখারি, মুসলিমসহ সব হাদিসগ্রন্থে বিদায় হজের ভাষণের বর্ণনা রয়েছে। তবে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. কর্তৃক সংকলিত ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে বিদায় হজের ভাষণসংক্রান্ত সর্বাধিকসংখ্যক উল্লেখ রয়েছে। তবে বিদায় হজের ভাষণের সারকথা হলো, রাসুল সা. অন্যায়ভাবে মানুষের রক্তপাত বন্ধ, সুদের কুফল, বর্ণবৈষম্যের ভয়াবহতা, স্বজনপ্রীতির বিরূপ প্রভাব, জাহেলি যুগের মানসিকতা পরিহার করার বিষয়ে জোরালো নির্দেশনা প্রদান করেছেন। নারীর অধিকার সংরক্ষণ ও তাদের মর্যাদার বিষয় তুলে ধরেছেন। সাম্যের ভিত্তিতে শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রের সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, শ্রমিকের অধিকার রক্ষা, পরমতসহিষ্ণু হওয়া, সর্বোপরি মানব সভ্যতাবিরোধী সব বর্বরতা পরিহার করে একনিষ্ঠভাবে কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন। ভাষণে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে উম্মাহর ঐক্যের বিষয়টি। তিনি বলেন, হে লোকসকল! জেনে রেখো, তোমাদের রব একজন এবং তোমাদের পিতাও একজন। জেনে রেখো, অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং আরবের ওপরও অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোর ওপর সাদার এবং সাদার ওপর কালোরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র ভিত্তি তাকওয়া। আমি কি তোমাদের কাছে পৌঁছিয়েছি? উপস্থিত সাহাবারা বলেন, হ্যাঁ, আল্লাহর রাসুল পৌঁছিয়েছেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৪৮৯)

জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যেসব অধিকার সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, যে অধিকার ছাড়া মানুষ পৃথিবীতে মর্যাদাসহ বাঁচতে পারে না। এমনকি স্বাভাবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটাতে পারে না। আধুনিক যুগে সেসব মৌল অধিকার মানবাধিকার নামে স্বীকৃত। রাসুল সা. সে সকল অধিকারকে সমুন্নত রাখতে বলেন, তোমরা প্রত্যেকে ভাই ভাই এবং সকলেই এক পিতা-মাতা থেকে সৃষ্ট। তোমাদের মধ্যে কেউই একে অপরের তুলনায় শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী নয়; কোন আরববাসী অনারবের তুলনায় শ্রেষ্ঠ নয়, তেমনি কোন অনারব লোকও আরবের তুলনায় শ্রেষ্ঠ নয়। সকল মানুষই আল্লাহর সৃষ্ট এবং একই বংশোদ্ভূত। (আকরাম ফারুক অনূদিত, সিরাত ইবনে হিশাম, পৃ- ৩৩০ ৩৩৭)

তিনি আরো বলেন, স্মরণ রেখো দুনিয়ার প্রত্যেকটি কাজের জন্য তোমাদেরকে একদিন আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। সুতরাং কখনো তোমরা সত্য পথভ্রষ্ট হবে না। প্রাগুক্ত। নারী জাতির মর্যাদা সম্পর্কে তিনি বলেন, নারীর উপর যেভাবে পুরুষের অধিকার আছে তেমনিভাবে পুরুষের প্রতিও নারীর অধিকার আছে। কাজেই নারীর সাথে সদয়রব্যবহার কর। (আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃ-৪৬০) তিনি বলেন, তোমরা দাস দাসীদের সাথে সদয় ব্যবহার করবে। তোমরা যেরূপ আহার করবে, যে বস্ত্র পরিধান করবে, তাদেরকে অনুরূপ খাদ্য ও বস্ত্র দান করবে। স্মরণ রেখো, তারাও আল্লাহর সৃষ্টি এবং তোমাদের মতই মানুষ। (দি স্পিরিট অব ইসলাম, পৃ- ১১৪)। অন্যায়ভাবে রক্তপাত প্রাণসংহার সম্মানহানি ও পরস্পর সম্পদহরণ পর সম্পদ হরণ তিনি হারাম ঘোষণা করেন। এ ভাষণে রাসূলে আকরাম সা. নরহত্যা ও ব্যভিচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

ভাষণের পরিশেষে মহান রাব্বুল আলামিন ইসলামকে পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ঘোষণা করে বলেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য দ্বীন পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নি’য়ামত পূর্ণ করলাম আর তোমাদের জন্য ইসলামকে জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম। (সূরা আল মায়েদা : ৩)
বিশ্ব মানবতার মুক্তির সনদ হিসেবে নবী মুহাম্মাদ সা. এর বিদায় হজের ভাষণের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শুধু ভাষণ নয়, যেনো মানবতার মুক্তির অমিয় বানী।

বিলাল হোসেন মাহিনী
পরীক্ষক : ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ও প্রভাষক : গাজীপুর রউফিয়া কামিল মাদরাসা, অভয়নগর, যশোর।
bhmahini@gmail.com ০১৮৪৩-৯০৪৭৯০

RELATED ARTICLES

Most Popular