Monday, March 29, 2021
হোমজাতীয়জিয়া কি আসলেই বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পালাতে সাহায্য করেছিল?

জিয়া কি আসলেই বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পালাতে সাহায্য করেছিল?

আরিফুর রহমান তুহিন

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িতরা চিহ্নিত। এদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। কিন্তু এরপরেও এই হত্যাকাণ্ডের আলোচনা শেষ হচ্ছে না। নেপথ্যে কে ছিল তা নিয়ে চলছে বিতর্ক। একথা সত্যি যে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বড় একটি শক্তি কাজ করছিল। কিন্তু একতরফাভাবে তৎকালীন উপ সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানের ওপর এর দায় চাপানো হচ্ছে। এমনকি বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পালাতে সহায়তার অভিযোগে মুক্তিযদ্ধে অবদানের জন্য জিয়াউর রহমানকে দেওয়া ‘বীর ‍উত্তম’ খেতাব কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জিয়া একাই কি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল? বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে কি জিয়ার একারই লাভ হয়েছে? জিয়া কি আসলেই খুনীদের পালাতে সহায়তা করছিল? এর উত্তর জানা যাবে তখনকার জাদরেল সেনা অফিসারদের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে। আসুন ইতিহাস থেকে কিছু জেনে নেই।

জেনারেল সফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান করা হয় ১৯৭৩ সালের ১০ অক্টোবর। ওই দিনই সফিউল্লাহর জ্যেষ্ঠ জিয়াউর রহমানকে উপ সেনাপ্রধান করেন বঙ্গবন্ধু। ১৫ আগস্টের পর্যন্ত সফিউল্লাহ ও জিয়া একই পদে ছিলেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে শফিউল্লাহকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত করেন জিয়া। সেই থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত ছিলেন। লে. কর্নেল সালাউদ্দীন সাড়ে চারটার দিকে রাস্তায় সৈন্য ও ট্যাংক চলাচলের খবর পেয়ে সেনাপ্রধান শফিউল্লাহকে ক্রমাগত ফোনে পাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। সফিউল্লাহকে আনুমানিক সোয়া ৫টার দিকে ফোনে পান সালাউদ্দীন। এরপর সফিউল্লাহ রাষ্ট্রপতিকে ফোনে পাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন।

বঙ্গবন্ধু যখন সফিউল্লাহকে ফোন দেন। বঙ্গবন্ধু ফোনে তার গলার আওয়াজ শুনেই বলে উঠলেন ‘শফিউল্লাহ তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে। কামালকে বোধ হয় মেরে ফেলেছে তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।’ উত্তরে বলেছিলেন, I am doing something, can you get of the house. জিয়া ও খালেদ মোশারফকে ফোন করে তাড়াতাড়ি তার বাসায় আসার কথা বলেন। ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে তারা বাসায় এসে পড়ে। জিয়া ইউনিফরম পরা ও সেভ করা এবং খালেদ মোশাররফ নাইট ড্রেসে নিজের গাড়িতে আসে। সেখানে দুজনকেই এরইমধ্যে জানা পরিস্থিতি জানালেন এবং খালেদ মোশাররফকে ৪৬ ব্রিগেডে তাড়াতাড়ি গিয়ে সাফায়াত জামিলকে সাহায্য করার জন্য নির্দেশ দেন। কারণ তখনও পর্যন্ত তার আগের দেওয়া নির্দেশের কোন তৎপরতা দেখতে পাচ্ছিলেন না।

এখানে দুটি প্রশ্ন রাখতে চাই। প্রথমত লে. কর্নেল সালাউদ্দীন সফিউল্লাহকে ট্যাংক বাহিনীর বিষয়ে অবগত করার পরে তিনি কেন সরাসরি অ্যাকশনে যাননি। ধরে নিলাম সফিউল্লাহ ধারণা করতে পারেননি এত বড় দুর্ঘটনা ঘটবে। কিন্তু তিনি অন্তত একটি ছোট টিমকে রেকি করতে পাঠাতে পারতেন। সেটাও কিন্তু করেননি। এমনকি কোনো প্রকার প্রস্তুতিও তিনি নেননি। এছাড়া সেনাপ্রধানের অন্যতম প্রধান দুই দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রপতি ও দেশকে জীবনের বিনিময়ে হলেও রক্ষা করা। বঙ্গবন্ধু যখন সফিউল্লাহকে জানালো ‘শফিউল্লাহ তোমার ফোর্স আমার বাড়ি অ্যাটাক করেছে। কামালকে বোধ হয় মেরে ফেলেছে তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।’ উত্তরে বলেছিলেন, I am doing something, can you get of the house.’ এরপর তিনি সাফায়েত জামিলকে খবর দেন ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। সফিউল্লাহর বিষয় আরেকটু জানা যাবে শাফায়েত জামিলের সম্পর্কে আলোকপাত করলে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শাফায়েত জামিল ১৯৭৪ সালে ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার নিযুক্ত হন। এটি একটি স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেড ছিল। যার অধীনে ছিল ৪ হাজার সৈন্য। সাফায়েত জামিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময়েও ৪৬ ব্রিগেডের প্রধান ছিল। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের অন্যতম এই নায়ককে জিয়াউর রহমান গ্রেফতার করে। পরবর্তিতে অন্যদের সঙ্গে জামিলকেও ক্ষমা করে দেওয়া হয়। ১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ সেনাবাহিনী থেকে তিনি অবসরপ্রাপ্ত হন। খুনী মেজর রশিদ ছিল শাফায়েত জামিলের অধনস্ত আর্টিলারি আর্টিলারি রেজিমেন্টটির অধিনায়ক।

জামিল নিজে বলেছেন, ‘মাসখানেক আগে সে ভারত থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশে ফেরে। তার পোস্টিং হয় যশোরে। কয়েক দিন পরেই সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ মেজর রশিদের পোস্টিং পাল্টে তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে আসেন। উল্লেখ্য, এ ধরনের পোস্টিং সেনাপ্রধানের একান্তই নিজস্ব দায়িত্ব।’ সভাবতই একটা প্রশ্ন জাগে, সফিউল্লাহ কেন তাকে নিজের ইচ্ছায় রশিদকে যশোর থেকে ঢাকা ক্যন্টনমেন্টে নিয়ে আসেন? খুনি মহিউদ্দিনসহ ১৫ আগস্টের কীটের বড় একটি অংশ ছিল আর্টিলারি রেজিমেন্টের।

বঙ্গবন্ধু হত্যায় যে দুটি ব্যটেলিয়ন অংশ নেয় তার একটি ছিল জামিলের ৪৬ পদাতিক ডিবিশনের আর্টিলারি রেজিমেন্ট। হত্যাকারীদের জন্য বড় আতঙ্ক হওয়ার কথা জামিলের ৪৬ পদাতিক ডিভিশন। কিন্তু ফারুক-রশীদ ওই বাহিনীকে ঠেকানোর কোনো পরিকল্পনা বা ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি সামান্য কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও নেয়নি তারা। হত্যাকান্ডের অন্যতম হোতা মেজর রশীদ নিজে গিয়ে জামিলের বাসায় হত্যার খবর দেয়। ‘‘আমার চমক ভাঙার আগেই রশিদ উচ্চারণ করল ভয়ংকর একটি বাক্য, ‘উই হ্যাভ কিল্ড শেখ মুজিব’। অস্বাভাবিক একটা কিছু যে ঘটেছে, সেটা আগন্তুকদের দেখেই বুঝেছিলাম। তাই বলে এ কী শুনছি! আমাকে আরও হতভম্ব করে দিয়ে রশিদ বলে যেতে লাগল, ‘উই হ্যাভ টেকেন ওভার দ্য কনট্রোল অব দ্য গভর্নমেন্ট আন্ডার দ্য লিডারশিপ অব খন্দকার মোশতাক।…আপনি এই মুহূর্তে আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশনে যাবেন না। কোনো পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া মানেই গৃহযুদ্ধের উসকানি দেওয়া।’’ এটি শাফায়েত জামিলের নিজের লেখা বাণী। প্রশ্ন হলো, সফিউল্লাহ যখন জামিলকে ব্যবস্থা নিতে বললেন তখন ৪ হাজার সৈন্য থাকার পরেও তিনি কেন ব্যবস্থা নিলেন না? তিনি ওই মুহুর্তে রশীদকে তিনি গ্রেফতার করতে পারতেন কিন্তু কেন করলেন না? তার অধিনস্থ অফিসার-সৈন্যরা এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করলো অথচ ব্রিগেড কমাণ্ডার হিসেবে তিনি কিছুই না জেনে পারলেন কীভাবে? এটাও কি বিশ্বাসযোগ্য? অথচ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই জামিলের দক্ষতার প্রমাণ মিলে। তিনি ছিলেন অন্যতম চৌকশ মুক্তিযোদ্ধা অফিসার। পাক হানাদারের আতঙ্ক জামিলকে এড়িয়ে তার বাহিনীরা দীর্ঘ দিন ধরে এত বড় একটি পরিকল্পনা কীভাবে করলো?

বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আক্রমনের খবর সর্বপ্রথম জানতে পারেন ডিজিএফআই ব্রিগেডিয়ার আব্দুর রউফ। একজন গোয়েন্দা ডাইরেক্টর তাকে রাত আড়াইটা-তিনটার দিকে ক্যান্টনমেন্টে ট্যাংক ও সৈন্য চলাচলের খবরটি দেন। তখনও ট্যাংক বহর ক্যান্টনমেন্টের বাইরে বড় রাস্তায় বের হতে কেবল প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই জরুরি গোপন বার্তা পেয়ে রাষ্ট্রপতিকে রেড টেলিফোনে সর্তক করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি চুপচাপ থাকলেন। রাত তিনটা থেকে ভোর সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত ডিজিএফআই ব্রিগেডিয়ার রউফ কি করেছিলেন?

এবার আসা যাক মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতি আতাউল গণি ওসমানী প্রসঙ্গে। জেনারেল ওসমানি বাংলাদেশ গঠনের পর বঙ্গবন্ধু সরকারের এমপি হয়েছিলেন। বাকশাল গঠনের পর দুজন সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেন। একজন হলেন ওসমানি ও অন্যজন হলেন ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়ার ছেলে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এরপর কিছুদিন আলোচনার বাইরে ছিলেন মি. ওসমানী। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর খুনের রাষ্ট্রপতি হিসেবে খন্দকার মোশতাক নিয়োগ পান। ১৯৭৫ সালের ২৯ আগস্ট ওসমানিকে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে নিযোগ দেন তিনি। অবাক করা বিষয় হলো, সাদরেই জনাব ওসমানী এই পদটি গ্রহণ করেন। ৩ নভেম্বরের অভ্যত্থানের পূর্ব পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। মোশতাক ও জেনারেল ওসমানি এক দিনেই পদত্যাগ করেন। এতদিন খুনীরাও মোশতাক-ওসমানীদের সঙ্গে বঙ্গভবনে একপাতেই খেয়েছেন।

মোশতাক-ওসমানীর সঙ্গে খুনীদের হৃদ্যতা ছিল বহুত খুব। হত্যাকাণ্ডে এই দুজন সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছেন। জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করেছেন মোশতাক এটা যেমন ঠিক, তেমনি বঙ্গবন্ধু শফিউল্লাহর পরে জিয়াকে সেনাপ্রধান করবেন এমন প্রতিশ্রুতিও ছিল। অন্যথায় জিয়াকেও সেনাবাহিনী থেকে অবসর দিয়ে দিতেন। তাই এটা মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে, দুদিন পরে হলেও জিয়া সেনাপ্রধান হবেন। একটা জায়গায় অবশ্যই জিয়াকে দোষী সাব্যস্ত করা যায়। জিয়াকে যখন খুনীরা ‘একটা কিছু করার’ (অভ্যত্থান) বিষয়ে অবহিত করেছিল তখন জিয়া তাদের বাধাও দেননি আবার সম্মতিও দেননি। তিনি বলছিলেন, ‘আমি এসবের মধ্যে নেই। তোমরা যদি কিছু করতে চাও তাহলে করতে পারো। আমাকে এসবের মধ্যে জড়িয়ো না।’ অর্থাৎ জিয়া অভ্যুত্থানের উসকানির খবর জানার পরেও কিছু না বলাটা অবশ্যই অন্যায় করেছে। কিন্তু ‍খুনীরা কেবল সরকারকে হটিয়ে নতুন সরকার বসানোর সম্মতি চেয়েছিল। হত্যাকাণ্ড ঘটবে এমন কোনো ইঙ্গিত ছিল না। আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বিনা রক্তপাতে অভ্যত্থান একটি সাধারণ বিষয় ছিল।

বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তি ঘটনার বর্ণনায় শাফায়েত জামিল লিখেছেন, ‘জিয়ার বাসার দিকেই পা চালালাম দ্রুত। কিছুক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করার পর দরজা খুললেন ডেপুটি চিফ স্বয়ং। অল্প আগে ঘুম থেকে ওঠা চেহারা। স্লিপিং ড্রেসের পাজামা আর স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে। একদিকের গালে শেভিং ক্রিম লাগানো, আরেক দিক পরিষ্কার। এত সকালে আমাকে দেখে বিস্ময় আর প্রশ্ন মেশানো দৃষ্টি তাঁর চোখে। খবরটা দিলাম তাঁকে। রশিদের আগমন আর চিফের সঙ্গে আমার কথোপকথনের কথাও জানালাম। মনে হলো জিয়া একটু হতচকিত হয়ে গেলেন। তবে বিচলিত হলেন না তিনি। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘So what, President is dead? Vice-president is there. Get your troops ready. Uphold the Constitution.’ সেই মুহূর্তে যেন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় ধ্বনিত হলো তাঁর কণ্ঠে। ডেপুটি চিফের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এলাম। আমাদের এখন একটা গাড়ি দরকার।’

খুনীরা ১৬ আগস্ট থেকে বঙ্গভবন ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘাটি গড়ে। তাদের কাছে ছিল ট্যাংক। তাই চাইলেই তাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব ছিল না। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ক্রমেই ভেঙ্গে পড়েছিল। শাফায়েত জামিল বারবার চাপ দিচ্ছিল সেনাদের ব্যারাকে আনতে কিন্তু জিয়া সময় নিচ্ছিলেন।

জিয়ার সামরিক দক্ষতা ছিল অসাধারণ। স্বাধীনতার যুদ্ধে দুজন সেক্টর কমাণ্ডার নিজ হাতে শত্রুকে গুলি করেছেন। এদের একজন ছিলেন জিয়া এবং অন্যজন ছিলে খালেদ মোশাররফ। আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, জিয়াউর রহমান চাইছিলেন শত্রুপক্ষকে মানসিক চাপে রাখতে। এতগুলো সৈন্য কোনো প্রকার রশদ ছাড়া ক্যান্টনমেন্টের বাইরে অবস্থান করা কঠিন। একদিন এদের রশদ ফুঁড়াবেই। সেই সময়েই জিয়া খুনীদের নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন হয়তো। আরেকটি হতে পারে এমন যে, ট্যাংক বাহিনীকে কীভাবে তিনি সামলাবেন তা নিয়ে হয়তো জিয়া কিছুটা অস্বস্তিতে ছিলেন। কারণ, সু-স্বজ্জিত একটি বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে রক্তপাত হতে পারে, যা রূপ নিতে পারে গৃহযুদ্ধে। এমনিতেই খুন করলে মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞান থাকে না। খুনীদের মনে এই ভয়ও ছিল যে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হতে পারে। তবে তিনি শাফায়েত জামিলকে অন্তত ৩ বার কথা দিয়েছিলেন সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনবেন এবং সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবেন।

বঙ্গবন্ধুকে পালাতে সাহায্য করলো কারা: ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেনারেল খালেদ মোশাররফ অভ্যত্থান ঘটায়। খালেদ সামনে থাকলেও এর পেছনে ছিল শাফায়েত জামিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় থেকেই দুজনের মধ্যে অত্যন্ত আন্তরিকতার সম্পর্ক ছিল। খালেদ বিদ্রোহ ঘটালেও জিয়াকে হত্যা করেননি। বরং তাকে গৃহবন্ধী করে তার বাড়ির সামনে সৈন্য পাহারা বসায়। এরপর জিয়াকে পদত্যাগ করতে জবরদস্তি করেন। জিয়াও শর্ত সাপেক্ষে পদত্যাগে রাজি হন। খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান হওয়ার জন্য বঙ্গভবনে দেনদরবার করেন। অথচ তার সামনে নিজেই ক্ষমতা নেওয়ার সুযোগ ছিল। বঙ্গভবনে খালেদ-জামিলের সঙ্গে ওসমানি-মোশতাকের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। অবশেষে ওসমানি-মোশতাক পদত্যাগ করেন। বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতি হন। খালেদ মোশাররফ হন নতুন সেনাপ্রধান।

বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পালানোর মুহুর্ত ঠিক এই সময়েই। ৪ নভেম্বর বিশেষ একটি বিমানে খুনিরা রেঙ্গুন (বর্তমানে ইয়াঙ্গুন) হয়ে থ্যাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক চলে যায়। সেখান থেকে পাকিস্তান সরকারের পাঠানো বিশেষ বিমানে করে তাদের লিবিয়ায় পাঠানো হয়। তখন সেনাবাহিনী চলছিল খালেদ-জামিলের নেতৃত্বে। জিয়া তখন খালেদের কারাগারে। মোশতাক-ওসমানি আমির থেকে সদ্য ফকির। মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন তখন গুরুতর অসুস্থ। প্রশ্ন হলো, বঙ্গবন্ধুদের খুনীরা দেশ ছেড়ে পালালো খালেদ-জামিলের শাসনামলে। তাহলে এর দায় কেন জিয়াকে বহন করতে হবে?????????

 

লেখক: সাংবাদিক

জনপ্রিয়